শ্রম কি? ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম ও শ্রমিক

0
354

এম. আহসান উল্লাহ | লেখক ও প্রাবন্ধিক, Lecturer, (Online) Global Islamic Education (GIE) USA

মানুষ জীবন যাপনের জন্য যেসব কাজ কর্ম করে থাকে তাকে শ্রম বলে। মানব জাতির অস্তিত্ব, প্রগতি, সভ্যতা ও উন্নয়ন-সবকিছুর মূলে রয়েছে শ্রম। তাই বলা হয়, ‘পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি’। কাজেই পরিশ্রম করা ছোট কাজ নয়, তা মানুষের মর্যাদাসম্পন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ক্ষুদ্র-বৃহত সব পেশা বা কার্যসম্পাদনের জন্যই মানুষকে অল্প-বিস্তর পরিশ্রমী হতে হয়। পার্থিব জগতে কোনো উন্নতি শ্রম ব্যতিরেকে সম্ভব হয়নি। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমের গুরুত্ব ও মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমের পরিচয়
শ্রম শব্দের আভিধানিক অর্থ মেহনত, দৈহিক খাটুনী, শারীরিক পরিশ্রম ইত্যাদি বলে| আর   جَهد. جهد . عمل ইংরেজিতে Labour বলে।
Cambridge Advanced Learners Dictionary তে বলা হয়েছে,
Labour means Practical work, especially that which involves physical effort.
অর্থনীতির পরিভাষায় শ্রম বলা হয়, “পারিশ্রমিকের বিনিময়ে উৎপাদনকার্যে নিয়োজিত মানুষের শারীরিক ও মানসিক সকল প্রকার কর্ম-প্রচেষ্টাকে শ্রম বলে।”
অধ্যাপক মার্শাল শ্রমের সংজ্ঞায় বলেন,“Any exertion of mind or body undergone partly or wholly with a view to earning some good other than the pleasure derived directly from the work.”  “মানসিক অথবা শারীরিক যে কোনো প্রকার আংশিক অথবা সম্পূর্ণ পরিশ্রম যা আনন্দ ছাড়া অন্য কোনো ধরনের উপকার সরাসরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়, তাকে শ্রম বলে।(আর্থ-সামাজিক সমস্যা সমাধানে আল-হাদীসের অবদান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, পৃ. ২৬৮।)
ইসলামী অর্থনীতির পরিভাষায় শ্রমের পরিচয় প্রদানে বলা হয়ে থাকে, “মানবতার কল্যাণ, নৈতিক উন্নয়ন, সৃষ্টির সেবা ও উৎপাদনে নিয়োজিত সকল কায়িক ও মানসিক শক্তিকে শ্রম বলে।” বাহ্যত এ শ্রম উৎপাদন কার্যে ব্যবহৃত হোক কিংবা পারিশ্রমিক না থাকুক অথবা সে পারিশ্রমিক নগদ অর্থ হউক কিংবা অন্য কিছু এবং শ্রমের পার্থিব মূল্য না থাকলেও পারলৌকিক মূল্য থাকবে। (মহাগ্রন্হ আল-কুর’আনে অর্থনীতি, পৃ. ১২২)

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম ও শ্রমিক:

দেশ ও জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হলো শ্রম। পৃথিবীতে যে জাতি যত বেশি উদ্দমী ও পরিশ্রমী, সে জাতি তত বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ। একজন দিনমজুরের শ্রম, কৃষকের শ্রম, শিক্ষকের শ্রম, অফিসারের শ্রম, ব্যবসায়ীর শ্রম সবই সমান মর্যাদার অধিকারী। শ্রমের মর্যাদা সমাজের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে। রাষ্ট্রকে উত্তরোত্তর এগিয়ে নিয়ে যায় উন্নতির শিখরে। ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে উপার্জনে উৎসাহিত করার জন্য পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
فاذا قضيت الصلاه فانتشروا في الارض وابتغوا من فضل الله
‘যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণে ব্যাপৃত হয়ে যাও।’ (আল কুরআন, সূরা আল-জুমুআ, আয়াত: ১০)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রমিকের পারিশ্রমিক দেয়ার ক্ষেত্রে বলেছেন
اعطوا الاجير قبل ان يجف عرقه
তোমরা শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে দাও তাদের ঘাম শুকানোর পূর্বে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  শ্রমের মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো ইরশাদ করেন,
طلب كسب الحلال فريضة بعد الفريضة
হালাল রিজিক অর্জন করা ফরজের পরে অন্যতম একটি ফরজ।

নবীদের পরিশ্রম
হজরত আদম (আ) থেকে শুরু করে সর্বশেষ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স) পর্যন্ত সব নবী-রাসূল নিজ হাতে কাজ করতেন। যেমন হযরত দাউদ (আ) নিজ হাতে লোহা দিয়ে বিভিন্ন আসবাব পত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।মুসা আ ছাগল চড়াতেন ইত্যাদি। স্বহস্তে কাজ সম্পাদন করা এটি অতিশয় উত্তম। রসূলুল্লাহ (স) শ্রমের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ ও শ্রমিকের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে বাণী প্রদান করে বলেছেন, ‘উত্তম উপার্জন হলো (পেশাজীবী) কর্মীর হাতের (শ্রমের) উপার্জন, যখন সে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে।’
হাদিস শরিফে আমরা রাসূল (সা) এর মেষ চড়ানোর কথাও আমরা দেখতে পাই। হাদিস শরিফে এসেছে,
عن ابي هريرة – رضي الله عنه- عن النبي صلى الله عليه وسلم قال ما بعث الله نبيا الا رعى الغنم فقال اصحابه وانت؟ فقال نعم كنت ارعاها على قراريط لأهل مكة
হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত: রাসূল (স:) বলেন, আল্লাহ এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি, যিনি বকরি না চড়িয়েছেন। তখন তাঁর সাহাবীগণ বলেন, আপনিও? তিনি বলেন, হা আমি কীরাতের (মুদ্রা) বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরাতাম। (সহিহ বুখারী, বাবু রায়া আলগানাম আলাল কিরাত, হাদিস নম্বর.২২৬২)

পারিশ্রমিক আদায়ে রাসূলের নির্দেশ
শ্রমিকের পারিশ্রমিক দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম অনেক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এক হাদীসে এসেছে “তোমরা শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তাদের পারিশ্রমিক আদায় কর”। পারিশ্রমিক আদায়ে যারা উদাসীন তাদেরকে কঠোর হুঁশিয়ারি করে রাসূল বলেছেন,
عن أبي هريره رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال قال الله تعالى خلاص أنا خصمهم يوم القيامه رجل أعطى بي ثم غدر ورجل باع حرا فأكله سمنه ورده من استأجر أجيرا فاستوفي من هو ولم يعطه أجره
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ,আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমি কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরোধী থাকবো। তাদের এক ব্যক্তি হলো, যে আমার প্রতিজ্ঞা করল, তারপর তা ভঙ্গ করলো। আরেক ব্যক্তি যে আজাদ ব্যক্তি ক্রয় করল এবং তার মূল্য ভক্ষণ করলো। আরেক ব্যক্তি হলো, যে কোন লোককে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করলো এবং তার হাতে কাজ পুরোপুরি আদায় করল, অথচ তার পারিশ্রমিক দিল না। (সহিহ বুখারী, বাবু রায়া আলগানাম আলাল কিরাত, হাদিস নম্বর২২৬৫)

পরিশেষে

ইসলাম শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম। ইসলাম মূলত এমন একটি  শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, যেখানে সব মানুষের অধিকারই সংরক্ষিত থাকে এবং চাওয়ার আগেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রত্যেকের অধিকার আদায় করে দিতে সবাই উদ্বুদ্ধ থাকে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে শ্রমের গুরুত্ব ও মর্যাদা, শ্রমিকের প্রতি মালিকের কর্তব্য এবং শ্রমের প্রতি শ্রমিকের কর্তব্য তথা মানবতার কর্মের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা অন্যান্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকামী সংস্থাগুলোর দেড় হাজার বছর আগে পৃথিবীকে শিখিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের শিক্ষাকে সমাজে, রাষ্ট্রে বাস্তবায়ন করে দেশের শ্রমবিভাগকে আরো উন্নত ও ত্বরান্বিত করার তৌফিক দান করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here