“ধর্ম যার যার, উৎস সবার” একটি ঈমানবিধ্বংসী শ্লোগান

0
347

মুফতী রিদওয়ানুল কাদির | লেখক, ইসলামিক স্কলার

অমুসলিমদের বিভিন্ন উৎসব আসলে মিডিয়াপাড়ায় উপরের বাক্যটি মোটামোটি হরহামেশাই দেখা যায়। শুধু তাই নয়, বরং বাক্য দুটি ঈমানের দাবীদার অনেক মুসলিম ভাই ও বোনকে বলতে শোনা যায়। এবং তাদের পোক্ত বিশ্বাস হলো, নিজের ধর্ম পালন করার পাশাপাশি অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করা শুধু বৈধই নয়, বরং কিছুটা তাদের দায়িত্বও!

এমন অনেক অজ্ঞ মুসলিম আছে, যারা জেনে অথবা না জেনে বিজাতীয় উৎসব পালন করে থাকেন যেমন পুজা, রাখি বন্ধন, নববর্ষের শুভেচ্ছা, বড়দিন, ভালবাসা দিবস ইত্যাদি। এছাড়াও আরও কতো দিবস যে আমরা পালন করে থাকি তার সঠিক হিসাব একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

এমন বহু মুসলিম রয়েছেন যারা অমুসলিমদের ধর্মীয় বা শিরকি উৎসবে নিজে অথবা পরিবারসহ উপস্থিত হন ও তাদেরকে শুভেচ্ছা জানান। অথবা নিজেরাই উৎসব উদযাপন করে থাকেন। কেউ কেউ নতুন পোশাক পরিধান করেন, উত্তম খাবারের ব্যাবস্থা করেন ও উপহার সামগ্রী আদান প্রদান করে থাকেন। আবার সমাজ ও রাষ্ট্রের গণ্যমান্য লোকদের মধ্যে কেউ কেউ এমন বিজাতীয় অনুষ্ঠানে সভাপতি হন অথবা সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকেন।

আল্লাহর নিকট মনোনীত ধর্ম একমাত্র ইসলাম
অথচ একথা সর্বজনবিদিত যে,
আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ও গ্রহণযোগ্য দ্বীন ইসলাম। এছাড়া আর যত ধর্ম বা মমতাদর্শ আছে তা সবই মিথ্যা ও বাতিল।
পবিত্র কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেনঃ ‘’নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম’’ আলে ইমরান ৩/১৯
মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেনঃ ‘’যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম গ্রহন করতে চাইলে, কখনো তার নিকট থেকে তা গ্রহন করা হবে না। এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’’ (আলে ইমরান ৩/৮৫)

যে ধর্মই গ্রহণযোগ্য নয়, তার উৎসব কিভাবে গ্রহণযোগ্য হবে?
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালার নিম্নোক্ত বাণীটি স্মরণ রাখুনঃ ‘’যারা কোনো মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না, আর বেহুদা কর্মকাণ্ডের সম্মুখীন হলে সসম্মানে পাশ কাটিয়ে চলে যায়’’ (তারাই হলো রাহমানের প্রকৃত বান্দা) (সূরা ফুরকান ২৫/৭২)

বিধর্মীদের উৎসবে শুভেচ্ছা জানালে অসুবিধা আছে?
কাউকে শুভেচ্ছা জানানো বা কারো শুভ কামনা করা মূলত ইসলামী পরিভাষায় দু’আর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং অমুসলিমদের জন্য হিদায়াত ব্যতীত অন্য কোনো দু’আ করা কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘’নবী ও মুমিনদের জন্য শোভনীয় নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তারা আত্মীয়-স্বজন হলেও, যখন এটা তাদের কাছে সুস্পষ্ট যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী’’ তাওবা ৯/১১৩

শিরকি উৎসবে অংশগ্রহণ তো দুরের কথা, বরং সেই স্থানে উপস্থিত হওয়াও হারাম!

সাবিত ইবন দাহহাক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ)-এর যুগে এক ব্যক্তি মানত করে যে, ‘বুওয়ানা’ নামক স্থানে একটি উট যবেহ করবে। সে নবী (সাঃ)-এর নিকট এসে বলল, আমি ‘বুওয়ানা’ নামক স্থানে একটি উট কুরবানি করার মানত করেছি।
নবী (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, সেখানে কি জাহেলী যুগের কোনো মূর্তি রয়েছে? লোকেরা বলল, না। নবী (সাঃ) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, সেখানে কি তাদের কোনো মেলা বসতো? লোকেরা বলল, না। অতঃপর নবী (সাঃ) বললেন, তোমার মানত পূর্ণ করতে পারো। কেননা আল্লাহর নাফরমানীমুলক কাজের জন্য মানত পূর্ণ করা জায়েয নয়। এবং আদম সন্তান যে জিনিসের মালিক নয় তারও কোনো মানত নেই’’ (আবু দাউদ শরীফ ৩৩১৫)

বিধর্মীদের উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো সম্পর্কে দারুল উলুম দেওবন্দের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত:

যে ব্যাক্তি আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমানের দাবী করে, মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে শেষ নবী হিসাবে স্বীকার করে, পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে এমন কোনো ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করা, তাদেরকে সহযোগিতা করা। এমনকি তাদেরকে শুভেচ্ছা জানানোও কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ হতে পারেনা।
একজন মুসলিমের কোনো কাজই বৃথা নয়। তাকে যেকোন কাজ করার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে এবং তাঁকে খেয়াল রাখতে হবে যে, এই কাজের মাধ্যমে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারছে কিনা।

এই সম্পর্কে সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ তাদের ওয়েবসাইটে যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া প্রকাশ করেছে।
সেটি হলো, মুসলিম ভাইয়েরা পূজার শুভেচ্ছাবার্তা জানানোর ক্ষেত্রে সংযত হই।

দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল ইফতা এক ফতোয়ার উত্তরে জানিয়েছে,
“অমুসলিমদের পূজা অনুষ্ঠান ও উৎসব ইত্যাদি তাদের শিরকসর্বস্ব আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে হয়ে থাকে।
কাজেই আমাদের দায়িত্ব হলো, মুশরিকদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কহীনতার কথা জানিয়ে দেব।
যেহেতু শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে তাদের চিন্তাধারা ও ও বিশ্বাসের সমর্থন ও সত্যায়ন হয়, সেহেতু এ কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
অনেক সময় এ কাজগুলো ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণও হয়। মহান আল্লাহই ভালো জানেন।” তথ্যসূত্র :
ফতোয়া নং : 145649।

মুসলমানদের উৎসব কয়টি?
আমরা জানি, মুসলিমদের উৎসবের দিন দুটি- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ ‘’প্রত্যেক জাতির জন্যই আনন্দোৎসব রয়েছে। আর এটা (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা) হল আমাদের আনন্দের দিন’’
(বুখারী ৯৪৯, ৯৫২, ৯৮৭, ৩৯৩১)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) মদীনায় আগমন করার পর দেখেন, মদীনাবাসীরা নির্দিষ্ট দুটি দিনে খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ করে থাকে। নবী (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, এ দুটি কিসের দিন? তারা বলল, ইসলামের পূর্বে জাহেলিয়াতের সময় এ দিন দুটিতে আমরা খেলাধুলা করতাম।
তখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, এ দু দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য আরও উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। এর একটি হল ঈদুল আযহার দিন অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন।
(নাসায়ী ১৫৫৬; আবু দাউদ ১১৩৪; মিশকাতুল মাসাবীহ ১৪৩৯)

দূর্গাপূজা এটা সার্বজনীন উৎসব কিভাবে হয়?
বাৎসরিক ঈদ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এবং সাপ্তাহিক ঈদ জুম’আ ছাড়া অন্য কোনো দিনকে উৎসবের দিন হিসাবে পালন করা মুসলিমদের জন্য উচিৎ নয়। আর দূর্গাপূজা যেটা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উৎসব, সেটা সার্বজনীন হওয়ার প্রশ্নই আসেনা।
আমাদের দেশের কতিপয় মিডিয়া শারদীয় দুর্গাপূজাকে সার্বজনীন উৎসব বলে প্রচার করে যাচ্ছে। অথচ তা প্রকৃত অর্থে সার্বজনীন নয়। হিন্দু সম্প্রদায় শারদীয় দুর্গাপূজার শুরুতে যে “সার্বজনীন” শব্দটি ব্যবহার করে, তার দুটি অর্থ হতে পারে। প্রথম অর্থে সেটি শুদ্ধ হবে। দ্বিতীয় অর্থে তা পুরোপুরি ভুল বলে বিবেচিত হবে। প্রথম অর্থ হলো, এটা হিন্দুদের জন্যে সার্বজনীন বুঝায়। কেননা, হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগাভাগি করে নানা পূজার প্রচলন রয়েছে; কিন্তু এই পূজাটি তারা সকলে মিলে একসঙ্গে করে বিধায় তাদের কাছে সেটা সার্বজনীন। কিন্তু সার্বজনীন অর্থ যদি এটা নেয়া হয় যে, সব ধর্মের লোকেরা এটাকে একসঙ্গে পালন করবে, এটা যে সর্বাংশে ভুল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
সুতরাং এই উৎসব হিন্দুদের। তাই কোনভাবেই কোন পূজাকে উপলক্ষ করে “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” এ কথা বলা যাবে না। বরং এটা তো হিন্দুরাও বিশ্বাস করেনা। কারণ কোন হিন্দু তো মুসলমানদের ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহায় আনন্দ প্রকাশ করেনা। সুতরা তাদের উৎসবে আমাদের উল্লাস করাটা নিজেদের দেউলিয়াপনার প্রকাশ ছাড়া আর কিইবা বলা যায়?

এ সম্পর্কে হাদীস শরীফের সুস্পষ্ট ভাষ্য:
আর অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে যোগদান করা, উৎসবে সাহায্য করা অথবা সমর্থন দেয়া বা শুভেচ্ছা জানানো অকাট্য হারাম।
কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও হাদীস শরীফ থেকে থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমেরা শুধুমাত্র তাঁদের খুশির দিনেই উৎসব পালন করবে এবং বিজাতীয় রীতিনীতি ও তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকবে।
উমার ইবন খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ ‘’তোমরা আল্লাহর দুশমনদের ঈদে তাদের থেকে দূরে থাকো। (বাইহাকি ১৯৩৩৪)
তিনি আরও বলেন, (অপ্রয়োজনে) অনারবের ভাষা শিখো না এবং মুশরিকদের উৎসবের দিনে তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করো না।
আবদুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেনঃ ‘’যে ব্যক্তি অমুসলিমদের দেশে বসবাস করে, তাদের নওরোজ (নববর্ষ) ও উৎসব পালন করে এবং তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে এবং এই অবস্থায় মারা যায়, সেই ব্যক্তির তাদের সাথে হাশর হয়। নাউজুবিল্লাহ (বাইহাকি ১৯৩৩৫)

ইসলামিক স্কলাররা কী বলছেন?
ইমাম মালিক-এর অনেক অনুসারী বলেনঃ ”যে ব্যক্তি নওরোজের দিন তরমুজ ভাঙল, সে যেন শুকর যবাই করলো।
(আল-লাম ফিল হাওয়াদিসি ওয়াল বিদ’ ১/২৯৪)
আমর বিন মুররাহ বলেনঃ ‘’রহমানের বান্দারা শিরকি ব্যাপারে মুশরিকদের সহযোগিতা করে না। এবং (তাদের শিরকি অনুষ্ঠানে) নিজেকে মিশিয়ে দেয় না। (ইকতিযা ১/৪২৭)

একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে,
বিজাতীয় ও অমুসলিমদের অনুষ্ঠান বর্জন করা এবং ইসলামের দেয়া বিধান ও উৎসবই একজন মুসলিমের জন্য পালনীয়। এবং শুধুমাত্র এতেই একজন মুসলিম সার্বিক কল্যাণ লাভ করতে পারে।

তবে এখানে কোন ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ নেই যে, অমুসলিমদের সাথে পার্থিব লেনদেন হতে পারে, তাদের সাথে সদাচার ও সদ্ব্যবহার করতে হবে। প্রতিবেশী যদি অমুসলিম হয় তাহলে তাকে ইসলাম প্রদত্ত হক প্রদান করতে হবে।
তবে কোনো অবস্থাতেই তাদের ধর্মীয় উৎসবে যোগদান করা তো দুরের কথা কোনোরকম সাহায্য সহযোগিতা ও শুভেচ্ছা জানানো যাবে না।
মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করুন। নিজেদের ঈমান-আমলের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে জীবন অতিবাহিত করার তাওফিক নসিব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here