ইয়াবার ভয়াবহতা: বাঁচার উপায়

0
365

আ.হ.ম. আহসান উল্লাহ
বি.অনার্স. এম. এ. (আরবি) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

‘ইয়াবা’ এক অভিশাপের নাম, এক সর্বনাশা ছোবলের নাম। এটি এমন এক সামাজিক সমস্যা যা শুধু অপরাধের জন্ম দেয় এবং বিকাশ সাধন করে তাই নয়, এর তান্ডবে আজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বৃত্তের প্রাচুর্যে লালিত ধনীর দুলালদের সামাজিক মর্যাদা ও আভিজাত্যের দর্প। আদিকাল থেকেই এদেশে মাদকের উৎপাদন প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তা আজকের মত অবাধ ছিল না।

বহুদিন আগে থেকে এ দেশের সমাজ জীবনে গাঁজা, ভাং, আফিম, তারী, মদ, ফেনসিডিলের সেবন পরিলক্ষিত হয়। সাম্প্রতিককালে এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে ইয়াবা, আইস পিল, কোকেন, হিরোইন, মারিজুয়ানা। মদ, গাঁজা, আফিমের গ্রাহক ছিল সমাজের নিম্নবিত্ত পরিবারের বখাটে, বেকার ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। কিন্তু ইয়াবা সেবীদের মধ্যে অতিবিত্ত পরিবারের ছেলে মেয়ে, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী, চিত্র জগতের নামিদামি তারকা, সেলিব্রেটি ও  মডেলদেরকেও দেখা যায়।

মাদকসেবীদের ব্যাপক চাহিদার কারণে সারাদেশে মাদকের ব্যাপক  অবৈধ প্রচলন চলছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেল সারাদেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৭৩ লাখ। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ যুবক এবং ৪৩ শতাংশ বেকার। ৬৫ শতাংশ আন্ডার গ্রেজুয়েট। আর ১৫ শতাংশ উচ্চ শিক্ষিত। ঢাকায় রয়েছে প্রায় ১০  লাখ মাদকসেবী। শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলায় মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে অন্তত চার হাজার ইয়াবা আসক্ত। এক দিনে পুরো দেশে বিভিন্ন ব্রান্ডের মাদক বেচাকেনা হয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) মতে এক বছরে শুধু ইয়াবার বড়ি বিক্রি হয় ৪০ কোটির মতো। যার বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশের যে রিপোর্টগুলো আমাদের সামনে এসেছে তাতে দেখা যায়, মাদকসেবী সন্তানের হাতে ৩৯০ জন এর মত মা-বাবা খুন হয়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে স্বামীর হাতে ২৫৭ জন স্ত্রী খুন হয়েছে। মাদকের মরণ ছোবলে প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে যারা খুন হয়েছে তাদের সংখ্যা প্রায় ৭০০ জন। মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা ৩০ হাজার পেরিয়েছে। আমাদের জানা আছে এদেশে মাদকসেবী কন্যা ঐশীর হাতে পুলিশ অফিসার বাবা-মাও খুন হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতে হিরোইনের চাইতে ইয়াবার ক্ষতি বহুগুণ বেশি। মিথাইল অ্যসকিটামিন বা মেথামফিটামিন এবং ক্যাফেইনের মিশ্রণে ইয়াবা তৈরি হয়। ইয়াবা যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে বলে সামাজিক নৈরাজ্য ও অপরাধের জন্ম দেয়। ইয়াবা সেবীরা চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও খুনখারাবির মতো অপরাধে সহজেই লিপ্ত হয়ে থাকে। ইয়াবা সেবনের ফলে সাময়িক শারীরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও হ্রাস পেতে থাকে জীবনীশক্তি; আক্রান্ত হয় যকৃত, কিডনি ও মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র। মানবদেহে ইয়াবার দীর্ঘমেয়াদের উপস্থিতি ক্যান্সার, লিভারের রোগ, ডিমেনসিয়া, কিডনি রোগসহ আরো অনেক অপরিচিত রোগের জন্ম দিতে পারে । এ প্রসঙ্গে নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর James C. Garbutt বলেন,
Alcohol does all kinds of things in the body and we are not fully aware of all its effects. It’s a pretty complicated  little molecule.”
অর্থ: মাদক শরীরে সব ধরনের কাজ করে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে এখনও পুরোপুরি সচেতন নয়। এটা মূলত একটি জটিল অনু।

ইয়াবার ভয়াল ছোবল থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য মানুষের জীবনে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ শিক্ষা ও বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা কেবল বাঞ্ছনীয় নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি। কারণ মাদকের নেশায় একবার আসক্ত হয়ে গেলে কোনো মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন। ইসলামী পরিভাষায় চেতনা বিলুপ্তকারী যেকোনো মাদকদ্রব্যকে ‘খামর’ বলা হয় এবং এটা ব্যবহার করা হারাম। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ শয়তানের ঘৃণ্যতম কাজের অন্তর্ভুক্ত। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাক যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা কী এটা হতে নিবৃত্ত হবে না।’ (সুরা মায়েদা : ৯০-৯১)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই মদ এবং প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই হারাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে বরাবরই মদ পান করেছে এবং তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করেছে, সে স্বর্গীয় পানীয় থেকে বঞ্চিত থাকবে।’ (মিশকাত : ২/৩২৯)।

তিনি আরও বলেন, ‘তিন শ্রেণির লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না- নিত্য মাদকসেবী, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকারী এবং জাদু-টোনার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী।’ (মেশকাত : ২/৩৩৩)

অতএব, মাদক  একজন মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। বিভিন্ন  জটিল রোগের জন্ম দেয়। পরিবারকে নষ্ট করে দেয়। সমাজের মূল্যবোধ ছিনিয়ে নেয়। মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেয়। ছাত্রদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয় । আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়। তাই আসুন আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইয়াবার করাল গ্রাস থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here